
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জাহেদ
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপজেলা আনোয়ারা ও বাঁশখালী। এই দুই উপজেলার লাখো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে সড়ক ও সেতু কেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবতা হলো-দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু অবহেলা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আনোয়ারা ও বাঁশখালীর সংযোগস্থল তৈলার দ্বীপ সেতু। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির কোনো বড় ধরনের সংস্কার বা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেতুর বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অথচ প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল।
এমন পরিস্থিতিতে সেতুটির বর্তমান অবস্থা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সেতু দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া ব্যবহার করা হলে তা ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। তাই জননিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত সেতুটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
শুধু তৈলার দ্বীপ সেতুই নয়, বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়কগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। অনেক জায়গায় সড়ক ভেঙে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও আবার বর্ষা মৌসুমে কাদা ও পানির কারণে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিতে পারেন না, রোগীকে হাসপাতালে নিতে ভোগান্তি পোহাতে হয় এবং শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া হয়ে পড়ে কষ্টকর।
বিশেষ করে বাঁশখালী উপজেলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভিরিজের পাড়া সড়ক এখন চরম বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এই এলাকায় কৃষকেরা ব্যাপকভাবে সবজি চাষ করে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকার উৎপাদন করে থাকেন। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই রাস্তার করুণ অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে চাষিদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেক সময় পরিবহন সংকট ও রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এদিকে বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ডিসি সড়ক উন্নয়ন কাজ নিয়েও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। প্রায় দেড় বছর আগে এই সড়কের উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও এখনো তা সম্পূর্ণ হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ ঝুলে থাকায় এলাকাবাসী প্রতিদিন ধুলো, কাদা ও যান চলাচলের সমস্যায় ভুগছেন। উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ার পর দ্রুত শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের ধীরগতির কারণে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি অঞ্চলের উন্নয়নের মূল ভিত্তি। একটি এলাকার অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা অনেকাংশে নির্ভর করে সড়ক ও সেতুর ওপর। ভালো রাস্তা ও নিরাপদ সেতু না থাকলে কোনো অঞ্চলের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই আনোয়ারা ও বাঁশখালীর মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি-এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথগুলো দ্রুত সংস্কার ও উন্নয়ন করা হোক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক নিরাপত্তা। স্থানীয়দের মতে, বাঁশখালীর কিছু এলাকায় বর্তমানে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই মাদক। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাদকের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে মাদক নির্মূল করা অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে স্থানীয়দের অভিযোগ-বাঁশখালীর সরল ইউনিয়ন এখনো উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে এই ইউনিয়নকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই জনপদ উন্নয়নের সম্ভাবনায় ভরপুর। কৃষি, মৎস্য ও স্থানীয় অর্থনীতির দিক থেকে এই অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অবহেলিত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি ও দায়িত্বশীল দপ্তরের প্রতি জোর দাবি জানানো হচ্ছে- তৈলার দ্বীপ সেতুর অবস্থা দ্রুত পরিদর্শন করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হোক। বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ সড়ক দ্রুত সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হোক। পুকুরিয়া ইউনিয়নের ডিসি সড়কের অসমাপ্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।
কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করে কৃষকদের উৎপাদন বাজারজাত করার সুযোগ সহজ করা হোক। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ জোরদার করা হোক। সময়ের দাবি এখন একটাই-অবহেলা নয়, কার্যকর উদ্যোগ। দ্রুত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আনোয়ারা ও বাঁশখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও আধুনিক করে তুলতে হবে। এতে শুধু মানুষের দুর্ভোগ কমবে না, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।

