
বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত শব্দ সংস্কার। আলোচনার শুরু হয়েছিল ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ পদ দুটি দিয়ে। এ সংস্কারের জন্যই বিভিন্ন ভাগে ‘সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশের আলোকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যেসব সংযোজন-বিয়োজন করা সম্ভব হবে বলে অনুমান করা যায়, তার ফলাফল হিসাবে রাষ্ট্রের সংস্কার হবে মর্মে ধারণা করা হচ্ছে। সংস্কার শব্দটির কয়েকটি ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Reformation, Refurbishment, Renovation ইত্যাদি। বর্তমানে যে সংস্কার নিয়ে ঘোরতর আলোচনা চলছে, তা Reformation অর্থে। সংস্কার শব্দটি সাধারণ জীবনে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। রাষ্ট্রে সংস্কার শব্দের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শের যোগসূত্র রয়েছে। বিপ্লব শব্দটি যেমনি একটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বহুল ব্যবহৃত হয়, তেমনি সংস্কার শব্দটি পুঁজিবাদী মতাদর্শকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার হাতিয়ার (Tools)। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো, সংস্কারের মাধ্যমে কাঠামোর ছোটখাটো দুর্বলতা বা ফুটোগুলোকে মেরামত বা জোড়াতালি দিয়ে ব্যবস্থাটিকে সচল রাখা। যেমন-ঘরবাড়ি অনেক দিনের পুরোনো হলে তার কিছু খুঁটি, বেড়া, চালের দু-চারটি টিন বদলিয়ে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা বা ছিদ্রগুলো বন্ধ করা, যাতে ঘরে বর্ষার পানি না পড়ে। বিপ্লবীদের কাজ হলো, নতুনভাবে কাঠামো নির্মাণ করা। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অংশীজন, অনুঘটক এবং শক্তিশালী অনুঘটকরা জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানকে বিপ্লব বলতে বেশি পছন্দ করেন। কেউ কেউ একে বিপ্লব বলতে চান না। তবে অপ্রাকৃত ভগ্নাংশের মতো একে অপ্রাকৃত বিপ্লব বলা যেতেই পারে। যা-ই হোক, বিপ্লব বা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কার্যক্রম মিশ্র বা উভচর প্রকৃতির। ‘বৃক্ষ তোর নাম কি? ফলে পরিচয়’। বাংলাদেশের বর্তমান বিপ্লবীরা পুঁজিবাদী সংস্কার করতে চায়। সে সংস্কারের রূপরেখাটি কেমন হবে? কত প্রকার এবং কী কী সংস্কার করা হবে? এ বিষয়ে ধারণা লাভের জন্য আমরা ১০টি সংস্কার কমিশনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারি। কিন্তু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও সংস্কার কমিশন করার দাবি দেখা যাচ্ছে। আরও যদি ১০টি কমিশন করা হয়, তাহলে কি সংস্কারের দাবি মিটবে? সংস্কারের জন্য যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হয়েছে, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ওই ক্ষেত্রগুলোই কি যথেষ্ট? ক্ষেত্রগুলো যদি যথেষ্ট হয়ও, তাহলেও সংস্কারগুলো যে গভীরতায় প্রয়োজন, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি ওই গভীরতায় সংস্কার করতে পারবে? সরকারের কি সে মাপের সক্ষমতা রয়েছে? এ প্রশ্নগুলোই প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে।
